• Sunday, December 15, 2019

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিৎ করতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

  • Sep 22, 2018

ডি এম কপোত নবী : মানুষ মানুষের জন্য। জীবনে চলতে গেলে প্রত্যেকের ভলোমন্দ আছে। কেউ এর মাঝে সুস্থ থাকে আবার কেউ অসুস্থ হয়ে যায়। একটা সময় চিকিৎসার জন্য জেলার মানুষদের রাজধানী ঢাকা কিংবা শিক্ষা নগরী রাজশাহী ছুটে যেতে হত। কিন্তু বর্তমানে সারা দেশের ন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জেও স্বাস্থ সেবা উন্নত করতে বা জনগণের সেবা করতেই যেন এই সরকারের জন্ম। সেবা মানেই বড় ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করেছে এই সরকার।

সে লক্ষেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশত কোটি টাকার স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে। এই স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি ক্লিনিকের বাইরে দেয়া হচ্ছে। যার কারণে ডায়াবেটিক হাসপাতাল সম্প্রসারণে অর্থ প্রদান। বিশেষ করে চক্ষুসেবা দিতে বিশাল ভবন নির্মাণ করে কাজ শুরু হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে কিডনি সেন্টার ও হার্ট সেন্টার নির্মাণে বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ। এক কথায় একাধিক বিশেষায়িত রোগের চিকিৎসা দিতে এই আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে বিশেষায়িত রোগের দক্ষ চিকিৎসক বা কনসালটেন্ট এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানোর বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। যা গত ৪০ বছরে হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে জেলা শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ পাঁচটি উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় লোকসংখ্যা ১৬ লাখ পেরিয়ে গেলেও সরকারের গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা দেবার ব্যাপারে বহু ধরনের স্বাস্থ্যখাত বিদ্যমান থাকায় জনগণকে আর তেমনভাবে ছুটতে হচ্ছে না বড় বড় শহরের দিকে কিংবা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে।

৫ উপজেলায় ৫ টি সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এছাড়াও পুরো জেলায় ১৪৭ টি কম্যুনিটি ক্লিনিক, অর্ধ-শতাধিক বেসরকারী ক্লিনিক, পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও জেলা শহরে মা ও শিশু কেন্দ্র প্রতিদিন কয়েক হাজার শিশু ও অর্ধ সহস্রাধিক পুরুষ ও মহিলা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে এসব কেন্দ্রে। বিশেষ করে ৫ উপজেলার ৪৬ টি ইউনিয়নে আলাদা আলাদা স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। বিশেষ করে ১৪৭ কমিউনিটি ক্লিনিক একেবারে বিনা পয়সায় অর্ধ শতাধিক ওষুধ দেয়া হচ্ছে। এসব ওষুধের অধিকাংশ খুবই দামী হবার কারণে জনগণ পেয়ে খুব খুশি। বিশেষ করে মহিলা ও শিশু এসব ক্লিনিকে শতাধিক রোগ নিয়ে ছুটে আসে। ফিরে যায় নানান ধরনের ওষুধ ও দামী এন্টিবায়েটিক নিয়ে।

জেলার ছয় হাসপাতালে জনবল সঙ্কটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কিছুটা ব্যাহত হলেও গ্রামীণ জনপদের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো তা পুষিয়ে দিচ্ছেন সাধারণ গরিব মানুষের মধ্যে নানান ধরনের ওষুধ বিতরণ করে। বর্তমানে ১০০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালে কিছুটা জনবল সঙ্কট থাকলেও বহির্বিভাগে আসা রোগীরা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই। এমনকি বেডে থাকা রোগীরাও বঞ্চিত হচ্ছে না চিকিৎসা সেবা থেকে। ২১ জন ডাক্তারের কাজ করছেন ১২ জন চিকিৎসক। বয়সে তরুণ হবার কারণে সবদিক সামাল দিয়েও চিকিৎসা সেবা দেবার ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।

শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৭ টি পোস্ট থাকলেও ১২ ডাক্তার প্রত্যহ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৩ জনের মধ্যে কর্মরত রয়েছে ৬ জন, ভোলাহাট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৪ জন ডাক্তারের কাজ করছেন মাত্র ৫ জন, গোমস্তাপুর উপজেলায় ১৮ জন ডাক্তারের কাজ সামাল দিচ্ছেন ১০ জন। তারপরও নেই কোন অভিযোগ। জানা গেছে নবেম্বরে ৭ হাজার চিকিৎসক নতুনভাবে নিয়োগ দেয়া হলে তারা বিভিন্ন উপজেলায় যে ঘাটতি রয়েছে তা পূরণ করবে। চিকিৎসক সঙ্কট নিরসনে এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা সরকার চিকিৎসা সেবা জনগণের দৌরগোড়ায় পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন ডাক্তার নিয়োগ মফস্বল এলাকয়। এ-সব ডাক্তার মফস্বলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন বছর চাকরি করার পর অন্যত্র যেতে পারবেন। এই তিন বছরের স্বাস্থ্যসেবায় মফস্বলের জনগণ অনেক এগিয়ে যাবে। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী সমাধান হতে যাচ্ছে। যা স্বাধীনতা পরবর্তী ৪০ বছরেও হয়নি তা মাত্র ১০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে। ২০০৩ সালে ৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ায় ১৪ বছরেও দৃশ্যমান হয়নি জনবল বাড়ানোর। শত বছরের জেলা শহরের ৫০ শয্যার হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাবার ব্যাপারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তাই এটিকে প্রচলিত ভাবে চলমান করা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে বরাদ্দ দেন ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

২৫০ শয্যা হাসপাতাল না থাকলে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় না। তাই ৮ তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেন। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জেলায় জেলায় মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন।

তাই পূর্ণাঙ্গরূপ ছত্রিশ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ বেডের হাসপাতাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ২৫০ শয্যার ৮ তলা ভবনে থাকবে ১৫ টি কেবিন। ৫ টি অপারেশন থিয়েটার, এছড়াও থাকবে আইসিইউ বিভাগ, এসডিইউ বিভাগ, সিসিইউ বিভাগ, সিটি স্ক্যান ব্যবস্থা, বহির্বিভাগ চিকিৎসা ব্যবস্থা, চলাচলের জন্য ৩টি সিঁড়ি ও ২টি বেড লিফট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি ফল আজকের এই আধুনিক হাসপাতাল। ২০১৫ সালের জুনে কাজ শুরু হয়ে ১০ তলার মধ্যে ৮ তলার কাজ শেষ হয়েছে। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু হলে রোগীদের খাদ্য, ওষুধসহ নানামুখী আধুনিক সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

নতুন ভবনে অক্সিজেন প্লান্ট, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য মিনি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সিভিল সার্জন বলেন প্রশাসনিক অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ হলেই ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল জেলার মানুষকে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া সম্ভব হবে বলে নিশ্চিত করেন। ভবনে স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হেলথ পপুলেশান এ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এইচপিএননসডিপি) আওতায় আনা হবে। এখন বাকি মেডিক্যাল কলেজ। এই ধরনের মেডিক্যাল কলেজের জন্য এতদিন অভাব ছিল বড় একটি হাসপাতালের। যা পূরণ হয়েছে। এখন মেডিক্যাল কলেজের ঘোষণা আসতে দেরি।

এদিকে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সেবা দেবার যে প্রথা চালু আছে তা আরও আধুনিক করা হবে বলে জানা গেছে। তাছাড়া তাদের অধীন রয়েছে জেলা শহরে শিশু স্বাস্থ্যসেবা। এই সেবা পেয়ে থাকে মা ও শিশুরা। শুধু তাই নয় গর্ভবতী মহিলারা এইসব কেন্দ্রে ১২ মাস সবধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পর প্রসব বেদনা নিয়ে ছুটে আসলে তাদের অপারেশন থেকে শুরু করে সবধরনের চিকিৎসা সেবা ও বিনা পয়সায় ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

পুরো জেলাজুড়ে গরিব মানুষ ও তাদের পরিবার পরিজনের স্বাস্থ্যসেবা দিতে সার্বক্ষণিক বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে। সরকারী বেসরকারী মিলিয়ে ক্লিনিকের যে সেবা। তাছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জেলা শহরে আড়াই শ’ বেডের হসপিটালে সেবা দান শুরু হলে জেলায় শতভাগ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা একেবারে নিশ্চিত হয়ে পড়বে। কারণ এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিদিন যে পরিমাণ ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করে তার পরিমাণ ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে ঘরবাড়ীর সংখ্যা। সেই সাথে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রগুলোও সব সময় উপচেপড়া ভিড় লেগেই থাকবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতেই আজকের এই ১০ তলা বিশিষ্ট আড়াইশ শয্যার হাসপাতাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।