• Monday, December 16, 2019

ছেলে যেন বাবার সম্মান রাখতে পারে: জাহানারা কামারুজ্জামান

  • Jul 29, 2018

একুশ বছর পর রাজণাহীবাসীর সামনে হাজির হয়েছেন তিনি। দোয়া চাইছেন। ১৯৭৫ সালে জেল হত্যাকা-ে নিহত জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের স্ত্রী জাহানারা কামারুজ্জামান প্্রতিদিন দূরদূরান্তে বেরিয়ে পড়ছেন ছেলে খায়রুজ্জামান লিটনের প্রচারে। সাথে থাকছেন ননদ মীরা, পাপুল, জা টুটুল, রুবি, মনজু। মাথায় সূর্য্যকে সাথী করে গরম উপেক্ষা করে ছুটে চলেছেন। ডায়াবেটিক আর হার্টের রোগী বার্ধক্য ভুলে কাজে নেমেছেন।

কমলাপাড় সাদা শাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। ফর্সা টকটকে চেহারা। বয়সের ছাপ আলতো করে ছুঁয়েছে কেবল। আগলে রেখেছেন কুড়ি বছরের অব্যক্ত স্মৃতি। সুখের। দুঃখের। আনন্দের। বেদনার। দুচোখ ভরে আজও হাজারো জিজ্ঞাসা। রাতের অন্ধকারে হত্যা কেন? দিনের আলোয় ওরা সাহস পেলোনা কেন? রিক্ত মলিন চাহনি। জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হারিয়ে আজও যিনি অপেক্ষায় আছেন বিচারের, তিনি মিসেস জাহানারা জামান (৫৫)।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ বর্বর নিষ্ঠুরতায় হত্যা করা হয় স্বাধীনতার অন্যতম চার স্থপতিকে। তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও রাজশাহীর কৃতি সন্তান এএইচএম কামারুজ্জামানকে।

একুশ বছর ধরে বুকের গভীরে জমে থাকা একরাশ বেদনা নিয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে রেখেছিলেন। রাজধানীর মন্ত্রীপাড়া থেকে রাজশাহী ফিরে ভাঙ্গা বাড়িতে উঠে ছেলেমেয়ে মানুষ করার সাধনায় নিবেদিত হয়েছিলেন।

সকালে গিয়ে পৌছে দেখলাম উনি বের হবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বললেন, রাজনীতির সাথে আমিতো জড়িত হইনি। কিন্তু ছেলের জন্য মা হিসেবে আমি কিছু করতে চাই। রাজশাহীবাসীর ঘরে ঘরে যাচ্ছি। সবার কাছে দোয়া চাইছি ছেলের জন্য। আমি চাই বাবার অসমাপ্ত কাজ ও যেন শেষ করতে পারে। সাড়া পাচ্ছি। গ্রামের মানুষ এখন অনেক সচেতন। উনার আমলে চারবার ভোট হয়েছে। ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০ ও ১৯৭৩। তখন খুব কম বাইরে বেরিয়েছি। এখন যুগের পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের পুরনো মানুষজন লিটনের দাদা বাবার নাম শুনে হাউমাউ করে কাঁদছেন। আমাকে লোকজন দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠছেন। কিন্তু সব জায়গায় তো যেতে পারছি না। এখন পর্যন্ত তো মানুষতো আশা দিচ্ছে। বলছে আমরা শুনেছি লিটন ভালো ছেলে নেশা করেনা। বদঅভ্যাস নেই। যোগ্য ছেলে। এখন রায় দেবে জনগণই। তবে কালো টাকা আমরা ছিটাতে পারবো না। কালো টাকা আমাদের নেই।

আমি ভয় পাই রাজনীতিকে। জেলখানায় আমার স্বামীকে ওরা গুলি করে মেরেছে। অপরাধ থাকলে প্রকাশ্য বিচার কেন হলো না? এজন্য খুবই ঘৃণা আমার রাজনীতিকে। আমি চাইনি ছেলে রাজনীতি করুক। শেখ হাসিনা আমার কাছে লিটনকে চেয়ে নিয়েছেন। বললেন, আমার তো সবই শেষ। আপনার তো একজন গেছে। ঘরে বসে থাকলে কি কারো মৃত্যু হয়না? ওরাই তো পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছে। ওরাই এদেশকে গড়বে। আমাকে দেন আপনার ছেলেকে। তারপর আমি রাজি হই। লিটনও তাই বলে। রাজনীতিতে শত্রু-মিত্র খাকতে পারে। ওদের রক্তে রাজনীতি। পাঁচপুরুষ থেকে রাজনীতি করছে। আমি কিভাবে ঠেকাবো?

এখন রাজশাহীবাসীর কাছে আমার আবেদন, আমার ছেলে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। বাবার সম্মান রাখতে পারে। সবার কাছে দোয়া চাই। (সংক্ষিপ্ত)

# (বাইশ বছর আগে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের মা জাহানারা কামারুজ্জামান ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে রাজশাহীবাসীর দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছিলেন ভোট চাইতে। এমপি পদে সেটিই ছিল লিটনের প্রথম নির্বাচন। সাপ্তাহিক দুনিয়া এর সম্পাদক সুলতানা শারমিন এর নেয়া তাঁর এই সাক্ষাতকারটি তখন ছাপানো হয় সাপ্তাহিক দুনিয়ায়। পরে ১১ জুন ১৯৯৬ জনকন্ঠে তা ছাপা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় তা সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হলো।)